চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি:হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান—যা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বন ও বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য—সেটি এখন এক শক্তিশালী অবৈধ সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বনভূমির ভেতর গড়ে উঠেছে একের পর এক অবৈধ হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও দোকানপাট। বন কর্তৃপক্ষ একাধিকবার উচ্ছেদ নোটিশ দিলেও রহস্যজনক কারণে বহাল তবিয়তে চলছে এসব অবৈধ স্থাপনা।
সাতটি ছড়ার বিস্তৃত সবুজ এই বন একসময় ছিল নানা প্রজাতির পশুপাখি ও বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল। কিন্তু বর্তমানে বনের কাঠ পুড়িয়ে রান্না, যত্রতত্র আবর্জনা ফেলা এবং দখলবাজদের আগ্রাসনে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে পুরো উদ্যান।
অবৈধ হোটেল সাম্রাজ্যের বিস্তার
অনুসন্ধানে জানা যায়, উদ্যানের ভেতরে মাধবপুরের মাসুম বিল্লাহ, চিত্ত দেব বর্মা, জুনায়েদ মোল্লা, মোস্তাক ও সাখাওয়াত হোসেন টিপুসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি সম্পূর্ণ অবৈধভাবে বনভূমি দখল করে হোটেল ও দোকান পরিচালনা করছেন।
প্রথমে ছোট টং দোকান দিয়ে শুরু হলেও সময়ের ব্যবধানে তা বড় আকারের হোটেলে রূপ নেয়। অভিযোগ রয়েছে, মাসুম বিল্লাহ একাই ৪-৫টি দোকানঘর নিয়ন্ত্রণ করছেন। এমনকি সাতছড়ির পুরাতন টিকিট কাউন্টারও তার দখলে চলে গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব ও বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতায় মোটা অঙ্কের মাসোহারা দিয়ে গড়ে উঠেছে এই অবৈধ ব্যবসা।
কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য
স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধান তথ্যে জানা গেছে, উদ্যানের ভেতরে থাকা তিনটি প্রধান হোটেল থেকেই দৈনিক গড়ে ১.৫ থেকে ২ লাখ টাকার খাবার বিক্রি হয়। প্রতিটি হোটেলের মাসিক লভ্যাংশ ৪.৫ থেকে ৬ লাখ টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
৩টি প্রধান হোটেলের মাসিক লাভ: প্রায় ১৮ লাখ টাকা
অন্যান্য টং ও ছোট দোকানের লাভ: প্রায় ৮ লাখ টাকা
মোট মাসিক অবৈধ লেনদেন: প্রায় ২৮ লাখ টাকারও বেশি
সব মিলিয়ে বছরে প্রায় কোটি টাকারও বেশি অবৈধ বাণিজ্য চলছে বলে অভিযোগ। অথচ সরকারের রাজস্ব খাতে জমা পড়ছে না একটি টাকাও।
স্থানীয় সূত্রে জানানো যায়, বিগত আওয়ামীলীগ ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে মাধবপুর নোয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা মাসুম বিল্লাহ কৌশলে সিএমসির সদস্য হন এরপর থেকে তিনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন নেতাদের সাথে হাত মিলিয়ে একে একে চার থেকে পাঁচটি দোকান কর দখল করেন ব্যবসা-বাণিজ্য এমনকি অবৈধ হোটেল ব্যবসা শুরু করেন। চতুর চালাক এই ব্যক্তি ৫ ই আগস্ট এর পর কৌশলে বিভিন্ন জামাত নেতাদের পরিচয় ব্যবহার করে এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হোটেল দোকান ঘর কি রাখার জন্য বহুরূপী প্রতারণার আশ্রয় নেন। এবং কথিত কয়েকজন সংবাদ কর্মীদেরকে তার হোটেলে কি খাওয়ানোর মাধ্যমে তাদেরকে দিয়ে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নেন এবং তার রেস্টুরেন্টই বৈধ বলে প্রচারণা চালান। অথচ সরকারি টিকেট কাউন্টার জিটি কিনা সরকারে নিজস্ব সম্পত্তি সেটি কি করে তিনি নেন সেচি কি করে তাকে আদালত দেন এ সমস্ত বিষয়ের তো পাওয়া যায়নি সুষ্ঠু কোন জবাব পাওয়া যায়নি। উল্টো তানিয়া কয়েকটি গণমাধ্যমে এসব বিষয়ে প্রতিবেদন আসলে তার জামা তার ভোটবাহিনী এতো তার জামাতের ভোটবাহিনী দ্বারা বিভিন্নভাবে প্রতিবেদক কে হয়রানি হামলা হুমকি সহ বিভিন্ন ভয় পিত্তি প্রদর্শন করান।
এভাবেই সাত চুড়ি জাতীয় উদ্যান কে সাত চুরি জাতীয় উদ্যান কে কিছু শাকচুন্নি জাতীয় উদ্যান কে কিছু প্রভাবশালীদের পকেটে নিয়ে তাদের রাম রাজত্ব কায়েম করেছে ওই এলাকায়। দাবি স্থানীয়দের।
ঢাকা থেকে আসা এক পর্যটক জানান,
“অন্য জায়গায় ১৫০০ টাকার খাবার এখানে ৪০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।”
সরকারি বাংলো দখলের অভিযোগ
আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, মোস্তাক হোটেলের মালিক জুনায়েদ মোল্লা বন অফিসের ভেতরে থাকা সরকারি বাংলো অবৈধভাবে দখল করে পরিবারসহ বসবাস করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, বনের ভেতর গড়ে তুলেছেন গরুর খামারও।
সরকারি জায়গায় থেকে বন উজাড় করে কাঠ পুড়িয়ে ব্যবসা চালিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন প্রভাবশালী এই চক্র।
দানবাক্সের টাকাও প্রশ্নের মুখে
বনের ভেতরে থাকা মসজিদকে কেন্দ্র করেও চলছে আরেক ধরনের বাণিজ্য। প্রতি শুক্রবার পর্যটকদের দানবাক্সে জমা হওয়া অর্থ কোথায় যায়—এ বিষয়ে স্পষ্ট জবাব পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের ধারণা, এই টাকার অংশও সিন্ডিকেটের পকেটে যাচ্ছে।
কথিত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে শেল্টারের অভিযোগ
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, কয়েকজন কথিত সংবাদকর্মী পরিচয়দানকারী ব্যক্তি নিয়মিত এসব হোটেলে বিনামূল্যে খাওয়া-দাওয়া করেন এবং বিনিময়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অবৈধ ব্যবসায়ীদের শেল্টার দেন। ফলে সাধারণ মানুষ মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন।
ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়
হোটেলগুলোর রান্নার উচ্ছিষ্ট, নাড়িভুঁড়ি, প্লাস্টিক, টিস্যু ও চিপসের প্যাকেট বনের বিভিন্ন স্থানে ফেলা হচ্ছে। এসব পচা খাবার ও প্লাস্টিক খেয়ে বানরসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী অসুস্থ হয়ে পড়ছে, এমনকি মারা যাচ্ছে।
আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, পর্যটকরা দোকান থেকে চিপস ও বিস্কুট কিনে বানরদের খাওয়াচ্ছেন। খাবারের লোভে বানরগুলো বন ছেড়ে পুরাতন ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে উঠে আসছে। ফলে দ্রুতগামী যানবাহনের চাপায় নিয়মিত মারা যাচ্ছে বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী।
বর্তমান সংকট এক নজরে:
• বনের কাঠ পুড়িয়ে রান্না → বৃক্ষ নিধন ও দূষণ
• প্লাস্টিক ও খাদ্যবর্জ্য → বন্যপ্রাণীর রোগ ও মৃত্যু
• চিপসের লোভ → বানর সড়কে এসে গাড়িচাপায় নিহত
সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ
বনের অভ্যন্তরে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন সাংবাদিকরা। সিএমসি গেট এলাকায় সাজিদ নামের এক যুবক সাংবাদিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। পরে সাংবাদিকদের সাইকেলে থাকা ক্যামেরা স্ট্যান্ড ও সিট কভার ব্লেড দিয়ে কেটে নষ্ট করে দেয় সিন্ডিকেটের সদস্যরা বলে অভিযোগ।
উদ্যানের ভেতর দিয়ে যাওয়া পুরাতন ঢাকা-সিলেট সড়কে সৌরবিদ্যুৎচালিত স্ট্রিটলাইট স্থাপন করা হলেও বর্তমানে একটি লাইটও সচল নেই। অন্ধকারের সুযোগে রাতের বেলায় মূল্যবান গাছ চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনাও বেড়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
প্রশাসনের বক্তব্য
বন সংরক্ষক মো. সানাউল্লাহ পাটোয়ারী বলেন,
“বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। বনের ভেতরে এসব কর্মকাণ্ড কীভাবে চলছে, সব তদন্ত করা হবে।”
চুনারুঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গালিব চৌধুরী জানান,“সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা দ্রুত আহ্বানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চুনারুঘাট থানার ওসি
শফিকুল ইসলাম বলেন,
“সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পুলিশের সহযোগিতা চাইলে আমরা তাৎক্ষণিক সহায়তা করব।”
সাতছড়ি রেঞ্জের দ্বায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তা মেহেদি হাসান জানান,বিগত কয়েক মাস পূর্বে বেশ কয়েকটি অবৈধ হোটেল ও দোকানপাট উচ্ছেদ করা হয়েছে। আবারো উচ্ছেদের বিষয়টি প্রক্রিয়া দিন।
স্থানীয়দের দাবি
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে এই হোটেল সিন্ডিকেট গুঁড়িয়ে দিতে হবে। বনের ভেতরের সব অবৈধ হোটেল সরিয়ে বাইরে নির্দিষ্ট স্থানে স্থানান্তর করলে পরিবেশ রক্ষা পাবে, পর্যটকরাও স্বাভাবিকভাবে সেবা পাবেন।
তাদের জোর দাবি—এই বন ধ্বংসের নেপথ্যের মূল হোতাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে সাতছড়িকে রক্ষা করতে হবে, নইলে অচিরেই হারিয়ে যাবে দেশের এক অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ।